
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর থেকে কালামপুর অংশে ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ কিংবা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শতাধিক অবৈধ ‘লেগুনা’। ব্যস্ততম এই মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের সক্রিয় নজরদারির চোখ এড়িয়ে কিংবা তাদের চোখের সামনেই দিনরাত চলাচল করছে এসব মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন। স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অঘোষিত চাঁদা বাণিজ্য ও প্রশাসনিক তদারকির অভাবেই নবীনগর থেকে কালামপুর পর্যন্ত পুরো রুটজুড়ে সাধারণ যাত্রী ও অন্যান্য যানবাহনের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাভার, নবীনগর ও ধামরাই সংলগ্ন স্থানীয় গ্যারেজগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরনো পিকআপের বডি কেটে পেছনে ধাতব খাঁচা ও কাঠের বেঞ্চ বসিয়ে বেআইনিভাবে এসব লেগুনা রূপান্তর করা হয়। বিআরটিএর প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ ধরনের মডিফাইড যানবাহনের কোনো রেজিস্ট্রেশন বা রুট পারমিট দেওয়ার বিধান নেই। নিয়ম অনুযায়ী ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী বসার কথা থাকলেও নবীনগর-কালামপুর অংশে পোশাক কারখানার শিফট পরিবর্তনের সময় ঝুঁকিপূর্ণভাবে ১৬ থেকে ১৮ জন যাত্রী গাদাগাদি করে এবং পেছনে ঝুলিয়ে পরিবহন করা হয়। চালকদের বড় একটি অংশ অনভিজ্ঞ ও লাইসেন্সহীন হওয়ায় এবং দ্রুত ট্রিপ শেষ করার প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর ফলে মহাসড়কের এই অংশটি প্রতিনিয়ত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার আতঙ্কে থাকছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, নবীনগর থেকে কালামপুর রুটে অবৈধ এসব যান টিকিয়ে রাখতে গড়ে উঠেছে পয়েন্টভিত্তিক সুসংগঠিত চাঁদা আদায়ের নেটওয়ার্ক। কালামপুর পয়েন্টে প্রতিদিন গাড়িপ্রতি ৬০ টাকা এবং জোপরা (জয়পুরা) পয়েন্টে ৩০ টাকা করে লাইন চাঁদা তোলা হয়। এর বাইরে লেগুনা মালিক সমিতির নামেও আদায় করা হয় অতিরিক্ত অর্থ। চাঁদার নির্ধারিত টাকা না দিলে মহাসড়কে লেগুনার ট্রিপ বা সিরিয়াল দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নবীনগর-কালামপুর রুটের একাধিক চালক ও মালিক জানান, বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও জীবিকার তাগিদে নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ করেই তাদের মহাসড়কে নামতে হয়। চাঁদাবাজির এই আর্থিক চাপ সামলাতেই তারা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী পরিবহন ও দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে বাধ্য হন।
চাঁদাবাজির অভিযোগ বিষয়ে কালামপুর লেগুনা মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুব বলেন, “লেগুনা থেকে নিয়মিত কোনো চাঁদা আদায় করা হয় না। তবে প্রশাসনিক বা থানা সংক্রান্ত প্রয়োজনে মাঝে মাঝে গাড়ি দিতে হয়।”
নবীনগর থেকে কালামপুর মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে গোলড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ সেলিম মাতুব্বর জানান, ফিটনেসবিহীন ও অনুমোদনহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত মামলা ও অভিযান পরিচালনা করছে। তবে একই বিষয়ে সাভার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলমের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে ও খুদেবার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর থেকে কালামপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে কীভাবে শতাধিক অবৈধ যান ও লাইসেন্সহীন চালক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে—তা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনকারীরা। তারা অবিলম্বে মহাসড়কের এই রুট থেকে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট উচ্ছেদ, অবৈধ লেগুনা চলাচল নিষিদ্ধ এবং স্থানীয় রূপান্তরকারী গ্যারেজগুলোতে সমন্বিত প্রশাসনিক অভিযান চালানোর জোর দাবি জানিয়েছেন।