ছবি সংগ্রহীত
অভিযানের পরই নতুন চুলা: সাভারে কমেনি অবৈধ সীসা কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া
- প্রকাশ : ০৪:৫৭:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
- / ৩০ বার পাঠিত

ঢাকার সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পরও বন্ধ হয়নি পরিবেশবিধ্বংসী অবৈধ সীসা উৎপাদন। উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের আওয়াল মার্কেট এলাকায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে স্থানীয় কয়েক হাজার বাসিন্দা তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন এবং মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
অভিযানের পরপরই নতুন চুলা নির্মাণ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তর ওই এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। সে সময় তিনটি অবৈধ কারখানার ছয়টি চুলা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে এই অভিযানের মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই চক্রটি নতুন করে আরও ছয়টি চুলা নির্মাণ করে পুনরায় তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। বর্তমানে সেখানে ছয়টি অবৈধ কারখানায় মোট ১২টি চুলার মাধ্যমে আগের মতোই পুরোদমে সীসা উৎপাদন চলছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় এসব অবৈধ কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, শরীয়তপুর জেলার নাসির মীর ও সাজু মিয়া এবং গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মো. মানিক সরকার, মো. মহসিন ও রতন নামের কয়েকজন ব্যক্তি এই অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাতের আঁধারে বিষাক্ত ধোঁয়ার রাজত্ব
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে শুরু করে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত চলে এই বিষাক্ত যজ্ঞ। পুরাতন ব্যাটারির ভেতরের প্লেট কাঠ ও কয়লার আগুনে গলিয়ে সীসা উৎপাদন করা হয়। এ সময় প্রায় ২ থেকে ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র অ্যাসিডের গন্ধ, ঘন কালো ধোঁয়া এবং বিষাক্ত বায়ু ছড়িয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগীরা জানান, রাতের বেলা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও এই বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাস থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে স্থানীয়দের মাঝে চোখ জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট, গলা জ্বালা ও মাথাব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। দীর্ঘদিন এই দূষিত পরিবেশে বসবাসের কারণে এলাকায় ফুসফুসের রোগ, দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও চর্মরোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আঘাত
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা পরিবেশে ব্যাটারির প্লেট পোড়ানোর সময় নির্গত সীসাযুক্ত ধোঁয়া ও অতিক্ষুদ্র কণা মানুষের শ্বাসনালীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। এটি মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি, যকৃত ও ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাবে শিশুদের মেধা ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
অন্যদিকে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য শুধু মানুষের জন্যই নয়, আশপাশের কৃষিজমি, গাছপালা, গবাদিপশু এবং জলাশয়ের জীববৈচিত্র্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি। মাটিতে সীসার কণা মিশে যাওয়ার ফলে খাদ্যশৃঙ্খল দূষিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনবে।
স্থায়ী সমাধানের দাবি এলাকাবাসীর
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রশাসনের সাময়িক বা আংশিক উচ্ছেদ অভিযান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হচ্ছে না। আইনি ফাঁকফোকর ও শিথিলতার সুযোগ নিয়ে অবৈধ কারখানাগুলো বারবার চালু হয়ে যাচ্ছে। তাই জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় আংশিক উচ্ছেদ নয়, বরং একই সীমানার ভেতরে পরিচালিত সব অবৈধ কারখানা স্থায়ীভাবে সিলগালা করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কীভাবে এই জনবিরোধী কার্যক্রম দিনের পর দিন চলতে পারছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।
এলাকার পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে ভুক্তভোগী বাসিন্দারা ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তর এবং সাভার উপজেলা প্রশাসনের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।











