ঢাকা ০৫:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

জলজট আর যানজটের মরণফাঁদে আশুলিয়া: বৃষ্টিতে থমকে গেছে শিল্পাঞ্চল

প্রতিবেদকের নাম, পদবী
  • প্রকাশ : ০৪:০১:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
  • / ১৬৬ বার পাঠিত

 

​নিজস্ব প্রতিবেদক | আশুলিয়া

টানা কয়েকদিনের মাঝারি ও ভারী বর্ষণে ঢাকার প্রবেশদ্বারখ্যাত শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অচল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট তীব্র জলাবদ্ধতায় মহাসড়কগুলো এখন একেকটি কৃত্রিম হ্রদে পরিণত হয়েছে। এই জলজটের জেরে নবীনগর-চন্দ্রা ও টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে সৃষ্টি হয়েছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট। ফলে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক এই জোনের চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে, আর চরম ভোগান্তিতে দিন কাটছে লাখ লাখ পোশাক শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীদের।

​টানা বৃষ্টির পর আশুলিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এবং তীব্র যানজটের প্রধান কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

​টানা বৃষ্টির ফলে আশুলিয়ার বাইপাইল মোড়, ডিইপিজেড (DEPZ), জামগড়া, ইউনিক, শিমুলিয়া এবং জিরাবো এলাকার মূল সড়কগুলো কোথাও হাঁটু, আবার কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টির পানির সাথে ড্রেন উপচে পড়া কারখানার রাসায়নিকযুক্ত নোংরা ও কালো পানি মিশে একাকার হয়ে গেছে। পানির নিচে সড়কের বড় বড় খানাখন্দ ও গর্ত লুকিয়ে থাকায় যানবাহনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে ধীরগতিতে চলাচল করছে। মাঝরাস্তায় সিএনজি, রিকশা ও ছোট গাড়ি বিকল হয়ে পড়ার কারণে পেছনের গাড়ির সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

​জলাবদ্ধতার কারণে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল থেকে একদিকে চন্দ্রা অভিমুখী এবং অন্যদিকে শ্রীপুর পর্যন্ত যানবাহনের চাকা প্রায় ঘুরছেই না। একই চিত্র টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কেও; আশুলিয়া বাজার থেকে আবদুল্লাহপুরমুখী লেনে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে গণপরিবহন ও পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যান আটকে থাকায় বাসের ভেতরেই চরম অস্বস্তিতে সময় পার করতে হচ্ছে যাত্রীদের। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নারী, শিশু এবং দূরপাল্লার রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সগুলো।

​আশুলিয়ার এই স্থায়ী জলজটের মূল কারণ সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব। কারখানার তরল বর্জ্য এবং যত্রতত্র ফেলা পলিথিন ও প্লাস্টিক আবর্জনা জমে বিদ্যমান ড্রেনগুলোর মুখ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া মহাসড়কের পাশে পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক কালভার্ট ও খালগুলো অবৈধ দখলের কারণে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার কোনো পথ পাচ্ছে না। ফলে বৃষ্টি থামার দীর্ঘ সময় পরও রাস্তা থেকে পানি নামছে না।

​সকাল ও বিকেলে শিফট পরিবর্তনের সময় যখন হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক একযোগে রাস্তায় নামেন, তখন পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। সড়কে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় বাধ্য হয়ে নোংরা ও কেমিক্যালযুক্ত পানি মাড়িয়েই শ্রমিকদের কারখানায় কিংবা ঘরে ফিরতে হচ্ছে। এতে তারা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। অন্যদিকে এই তীব্র যানজটের কারণে সময়মতো কাঁচামাল কারখানায় পৌঁছাতে পারছে না এবং উৎপাদিত তৈরি পোশাক বন্দরে পাঠানো বিঘ্নিত হচ্ছে, যা দেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

​বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে মহাসড়কে নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। এগুলো যত্রতত্র উল্টো পথে চলায় এবং মাঝরাস্তায় যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। টানা বৃষ্টির মধ্যে সড়কে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের চরম বেগ পেতে হচ্ছে।

​আশুলিয়ার এই দীর্ঘস্থায়ী নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল সাময়িক রাস্তা মেরামত বা জোড়াতালির উন্নয়ন কোনো কাজে আসবে না। বর্ষা মৌসুমের এই অভিশাপ থেকে বাঁচতে হলে সবার আগে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি সমন্বিত ও আধুনিক ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা (Master Plan) বাস্তবায়ন করতে হবে।

​একই সাথে সড়কের পাশের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং দখলকৃত প্রাকৃতিক খালগুলো উদ্ধার করা জরুরি। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং লাখ লাখ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থাকে অনতিবিলম্বে একযোগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ট্যাগ :

সংবাদটি শেয়ার করুন

জলজট আর যানজটের মরণফাঁদে আশুলিয়া: বৃষ্টিতে থমকে গেছে শিল্পাঞ্চল

প্রকাশ : ০৪:০১:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

 

​নিজস্ব প্রতিবেদক | আশুলিয়া

টানা কয়েকদিনের মাঝারি ও ভারী বর্ষণে ঢাকার প্রবেশদ্বারখ্যাত শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অচল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট তীব্র জলাবদ্ধতায় মহাসড়কগুলো এখন একেকটি কৃত্রিম হ্রদে পরিণত হয়েছে। এই জলজটের জেরে নবীনগর-চন্দ্রা ও টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে সৃষ্টি হয়েছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট। ফলে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক এই জোনের চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে, আর চরম ভোগান্তিতে দিন কাটছে লাখ লাখ পোশাক শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীদের।

​টানা বৃষ্টির পর আশুলিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এবং তীব্র যানজটের প্রধান কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

​টানা বৃষ্টির ফলে আশুলিয়ার বাইপাইল মোড়, ডিইপিজেড (DEPZ), জামগড়া, ইউনিক, শিমুলিয়া এবং জিরাবো এলাকার মূল সড়কগুলো কোথাও হাঁটু, আবার কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টির পানির সাথে ড্রেন উপচে পড়া কারখানার রাসায়নিকযুক্ত নোংরা ও কালো পানি মিশে একাকার হয়ে গেছে। পানির নিচে সড়কের বড় বড় খানাখন্দ ও গর্ত লুকিয়ে থাকায় যানবাহনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে ধীরগতিতে চলাচল করছে। মাঝরাস্তায় সিএনজি, রিকশা ও ছোট গাড়ি বিকল হয়ে পড়ার কারণে পেছনের গাড়ির সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

​জলাবদ্ধতার কারণে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল থেকে একদিকে চন্দ্রা অভিমুখী এবং অন্যদিকে শ্রীপুর পর্যন্ত যানবাহনের চাকা প্রায় ঘুরছেই না। একই চিত্র টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কেও; আশুলিয়া বাজার থেকে আবদুল্লাহপুরমুখী লেনে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে গণপরিবহন ও পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যান আটকে থাকায় বাসের ভেতরেই চরম অস্বস্তিতে সময় পার করতে হচ্ছে যাত্রীদের। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নারী, শিশু এবং দূরপাল্লার রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সগুলো।

​আশুলিয়ার এই স্থায়ী জলজটের মূল কারণ সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব। কারখানার তরল বর্জ্য এবং যত্রতত্র ফেলা পলিথিন ও প্লাস্টিক আবর্জনা জমে বিদ্যমান ড্রেনগুলোর মুখ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া মহাসড়কের পাশে পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক কালভার্ট ও খালগুলো অবৈধ দখলের কারণে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার কোনো পথ পাচ্ছে না। ফলে বৃষ্টি থামার দীর্ঘ সময় পরও রাস্তা থেকে পানি নামছে না।

​সকাল ও বিকেলে শিফট পরিবর্তনের সময় যখন হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক একযোগে রাস্তায় নামেন, তখন পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। সড়কে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় বাধ্য হয়ে নোংরা ও কেমিক্যালযুক্ত পানি মাড়িয়েই শ্রমিকদের কারখানায় কিংবা ঘরে ফিরতে হচ্ছে। এতে তারা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। অন্যদিকে এই তীব্র যানজটের কারণে সময়মতো কাঁচামাল কারখানায় পৌঁছাতে পারছে না এবং উৎপাদিত তৈরি পোশাক বন্দরে পাঠানো বিঘ্নিত হচ্ছে, যা দেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

​বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে মহাসড়কে নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। এগুলো যত্রতত্র উল্টো পথে চলায় এবং মাঝরাস্তায় যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। টানা বৃষ্টির মধ্যে সড়কে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের চরম বেগ পেতে হচ্ছে।

​আশুলিয়ার এই দীর্ঘস্থায়ী নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল সাময়িক রাস্তা মেরামত বা জোড়াতালির উন্নয়ন কোনো কাজে আসবে না। বর্ষা মৌসুমের এই অভিশাপ থেকে বাঁচতে হলে সবার আগে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি সমন্বিত ও আধুনিক ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা (Master Plan) বাস্তবায়ন করতে হবে।

​একই সাথে সড়কের পাশের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং দখলকৃত প্রাকৃতিক খালগুলো উদ্ধার করা জরুরি। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং লাখ লাখ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থাকে অনতিবিলম্বে একযোগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।