আশুলিয়ায় বার বার অভিযানের পরও থামছে না অবৈধ সিসা তৈরি, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ
- প্রকাশ : ১০:৫৮:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ৬৫ বার পাঠিত

ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের রাঙ্গামাটি এলাকায় গড়ে ওঠা একটি অবৈধ সিসা গলানোর কারখানার কারণে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মাওলানা বুলবুল আহমেদ নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন এই কারখানাটিতে প্রশাসনের একাধিক অভিযান ও জরিমানার পরও রাতের আঁধারে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাঙ্গামাটি বাজার সংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় স্থাপিত এই কারখানায় পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরি করা হয়। ব্যাটারি পোড়ানোর সময় নির্গত তীব্র বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও রাসায়নিক গ্যাসের গন্ধে পুরো এলাকায় এক অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের মতে, রাতের বেলা কারখানাটি চালু হলে দুর্গন্ধে ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যাহত হয়।
এই বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিকের প্রভাব পড়েছে গবাদিপশু ও কৃষিতেও। এলাকার এক ভুক্তভোগী কৃষক জানান, কারখানা চালুর পর থেকেই গ্রামে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে তার দুটি গবাদিপশু হঠাৎ মারা গেছে। এছাড়া কারখানার বিষাক্ত এসিড ও বর্জ্য পার্শ্ববর্তী গাজীখালী নদী ও ফসলি জমিতে গিয়ে পড়ছে। ফলে নদীর পানি ও কৃষিজমি বিষাক্ত হয়ে উঠায় ফসলের ফলন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসার বিষাক্ততা মানবদেহের জন্য চরম বিপজ্জনক। এটি বাতাসে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করলে শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং তাদের স্নায়ুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া সিসার ক্ষতিকর প্রভাবে রক্তশূন্যতা, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও লিভারের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ শিশু জন্মের বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
নথি ও স্থানীয় সূত্র মতে, গত দুই বছরে পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানাটিতে ১০টিরও বেশি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে কারখানার চুল্লি ভেঙে দেওয়া, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, জরিমানা আদায় এবং কারখানা সিলগালা করা হয়। এমনকি মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৩ জুন পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কিশোর কুমার দাসের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর এক অভিযানে কারখানাটি গুঁড়িয়ে দিয়ে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবার অভিযানের পর দু-একদিন বন্ধ রেখে একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় আবারও রাতের আঁধারে কার্যক্রম শুরু করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি শক্তিশালী চক্র এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে যুক্ত থাকায় তারা ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। বারবার বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জানিয়েও স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না।
এলাকাবাসীর আকুল আবেদন—জনস্বাস্থ্য, গবাদিপশু, কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন যেন এই অবৈধ সিসা গলানোর কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।












